
নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান শীত মৌসুমেও শাকসবজির অগ্নিমূল্য। অনেক আগেই গরিব বা নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে গরু, ছাগলের গোশত। ঊর্ধ্বমুখী মাছের দামও। তবে, গত কয়েক মাস জলো ভোক্তারা স্বস্তিতে রয়েছেন মুরগি ও ডিমের দর নিয়ে। বিশেষ করে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে ডিম। ভোক্তারা স্বস্তিতে থাকলেও মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে দেশের ক্ষুদ্র খামারি ও পোল্ট্রি শিল্প মালিকরা। কারণ, ফের বাজারে সক্রিয় মধ্যস্বত্তভোগীরা। গত অক্টোবর থেকে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে কম দামে ডিম ও মুরগি কিনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এতে খামারীরা লোকসান গুনলেও আগের মতোই ফুলে ফেপে উঠছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। লোকসান হওয়ায় ক্ষুদ্র খামারীদের পাশাপাশি দেশের ফিড মিল ও ব্রিডার ফার্মও নানা সময়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে পুরো পোল্ট্রিশিল্প টিকে থাকা চরম হুমকীতে রয়েছে। গাজীপুর, টাঙ্গাইলের একাধিক ক্ষুদ্র খামারীর সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ড্রাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, কোনো কারণে ডিম ও মুরিগর গোশতের দাম একটু বেশি হলেই হাউ কাউ শুরু হয়। আমাদের নানা জায়গা থেকে ডাক পড়ে। কিন্তু, গত কয়েক মাস হলো আমরা লোকসান গুণছি, সরকার বা কোনো পক্ষ থেকে ভ্রুক্ষেপ নাই। আমরা সরকারের সহযোগীতা কামনা করছি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত অক্টোবর মাস থেকে দাম ক্রমশ কমছে। কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের ন্যূনতম মূল্য ১০.৫৮ টাকা, পাইকারিতে ১১.০১ টাকা এবং খুচরায় ১১.৮৭ টাকা বেধে দেয়া হয়। কিন্তু, খামার পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম গড়ে ৭.৮৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন খরচ ১০.১৯ টাকা। ফলে প্রতিটি ডিম বিক্রি করে খামারির লোকসান গড়ে ২ থেকে ২.৩০ টাকা। দৈনিক উৎপাদন ৫ কোটি ৫০ লাখ পিস ধরে, গত এক মাসে খামারির লোকসান হয়েছে ৩০০ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, সোনালী ২৮০ টাকা, লেয়ার ৩০০ টাকা, দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জানা যায়, খামার পর্যায়ের ব্রয়লার প্রতি কেজি ১৬৮.৯১ টাকা ও সোনালী মুরগি ২৬০.৭৮ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু বর্তমানে খামার পর্যায়ে ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১২২ টাকায় এবং সোনালী মুরগি ১৭৫ টাকায়, যার ফলে খামারির প্রতি কেজিতে লোকসান দিচ্ছে ৪৬.৯১ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকসান গোনায় অনেক খামারী তাদের খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। লেয়ার ও ব্রয়লার খামার বন্ধ হওয়ার ফলে অচিরেই উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিমের ‘সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য’ সরকার নির্ধারণ করলেও ‘ন্যূনতম মূল্য’ নেই। দরপতনের সময় খামারিদের স্বার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
খামারীরা
বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের পরিস্থিতি
সামাল দিতে অফ-সিজনে খামারিদের
ভর্তুকি প্রদান করা হয়। অতিরিক্ত ডিম সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর শতাধিক কোল্ড স্টোরেজ খামারিদের উৎপাদন ধরে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে কোল্ড স্টোরেজে ডিম সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বিভিন্ন সময় কোল্ড স্টোরেজে অভিযান চালিয়েছে। এছাড়া, খামারি প্রতিটি ডজন ডিমে ২০-২৬ টাকা
লোকসান গুনলেও মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা ঠিকই ২০-২৪ টাকার
মুনাফা করছেন। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগিতে খামারির লোকসান ৪৫-৪৭ টাকা,
আর মধ্যস্বত্ত্বভোগীর মুনাফা ৪০-৪২ টাকা।
এ অবস্থায় পোল্ট্রি শিল্প রক্ষায় খামারিদের ঝরে পড়া রোধে কিছু প্রস্তাব করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ডিম ও মুরগির গোশতের ‘সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য’ নির্ধারণের পাশাপাশি ‘ন্যূনতম মূল্য’ নির্ধারণ, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণন কৌশলপত্র প্রণয়ন, অফ-সিজনে খামারিদের জন্য ভর্তুকি, কোল্ড স্টোরেজ ব্যবহারের অনুমোদন ও স্বল্প সুদে ঋণ, ডিম ও গোশত রফতানি সহজীকরণ এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। খামারিদের বর্তমান দুরবস্থা বিবেচনায় সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।